অ্যাকুরিয়ামে চাষ হচ্ছে আগ্রাসী মাছ, নদীতে ছড়িয়ে পড়লে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা
সম্প্রতি বাড়ি, অফিস কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অন্দরসজ্জায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অ্যাকুরিয়াম। এসব অ্যাকুরিয়ামে সৌন্দর্য বাড়াতে সাকার ফিশ, স্নেক-স্কিন গুরামি, ক্রোকিং গুরামি ও অ্যালিগেটর গার মতো ভয়ংকর বিদেশি মাছ সংযোজন করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এক্সপোর্ট জিনিয়াসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১.৪ কোটি টাকার (০.১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অ্যাকুরিয়াম মাছ বা রঙিন মাছ (অর্নামেন্টাল ফিস) আমদানি করা হয়।
অ্যাকুরিয়ামে রাখা বিদেশি মাছগুলো বাংলাদেশের নদী-খাল, বিল ও পুকুরে জড়িয়ে পড়ায় জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অব্যাহত দূষণের কারণে মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে অ্যাকুরিয়াম ও হ্যাচারি থেকে সাকার ফিশ, স্নেক-স্কিন গুরামি, ক্রোকিং গুরামি, ও অ্যালিগেটর গার মতো বিদেশি মাছ প্রাকৃতিক জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়লে দেশীয় মাছের খাদ্য, আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অ্যাকুরিয়ামের শোভাবর্ধক মাছ হিসেবে পরিচিত সাকার ফিশ সবচেয়ে বেশি আলোচিত বাংলাদেশের মৎস্য সংশ্লিষ্টদের। বুড়িগঙ্গাসহ কয়েক নদীও জলাশয় এমনকি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ মাছের প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীতেও শনাক্ত হয়। ফেনী ও নোয়াখালীর জলাশয়ে স্নেক-স্কিন গুরামি বা স্থানীয়ভাবে চায়না খলিশা বা হাইব্রিড খলিশা নামে পরিচিত মাছের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এছাড়া ২০০৮ সালে পিরানহা চাষ, উৎপাদন, ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা হলেও বিভিন্ন সময়ে বিক্রির খবর পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) এর ফিশ বায়োলজি অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কালবেলাকে বলেন, এটি দেশীয় মাছের সঙ্গে খাদ্য ও আবাসস্থল নিয়ে প্রতিযোগিতা করে এবং জলজ খাদ্যশৃঙ্খলে পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কোনো বিদেশি প্রজাতি মাছ, আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে গিয়ে বংশবিস্তার শুরু করলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
এসব আমাদের জলাশয়ে মেশে দেশীয় মাছের ডিম ও রেণু ভক্ষণ করে কৈ, শোল, মাগুর, শিং, বাটা, পুঁটি মাছগুলো হুমকি মুখে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিকর বিদেশি মাছের পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে অ্যাকুয়ারিয়াম ব্যবসায়ী ও সাধারণ পালনকারীদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা আবশ্যক।
যেভাবে অ্যাকুরিয়াম থেকে নদীতে যাচ্ছে:
অ্যাকুরিয়াম পরিষ্কার করা সময় এবং মাছের সংখ্যা বেড়ে যায়, গেলে অনেক মাছগুলো পুকুর, খাল, নদী, নালায় ছেড়ে দেন। এছাড়া বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা জলাবদ্ধতার কারণে হ্যাচারি ও মাছের খামার থেকেও মাছ প্রাকৃতিক জলাশয়ে পালিয়ে সেখানে বংশ বিস্তার করে।
অ্যাকুরিয়াম ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট নাজিম উদ্দীন বলেন, এক সময় সাকার ফিশ অ্যাকুরিয়ামের তলা পরিষ্কার রাখার জন্যও ব্যবহার করা হতো। কিন্তু প্রাকৃতিক জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ার পর মাছটি দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। পরিবেশগত ঝুঁকি কারণ ২০২৩ সালে সাকার ফিশের পরিবহন,বিপণন,সরবাহ নিষিদ্ধ করেছিল। ফলে বর্তমান সাকার ফিশ আমাদানি করা হয় না, চাহিদা নেই।
তিনি আরও বলেন, সৌন্দর্য বর্ধনে অনেক মাছ আমদানি করা হয়, কোনটা পরিবেশ জন্য ভয়ংকর এটা তো আমরা জানি না। সে বিষয়ে তেমন কোন নিদর্শনাও নেই।
অন্যদিকে অ্যালিগেটর গার বড় আকারের শিকারি মাছ। অ্যাকুরিয়াম বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি প্রজাতির মাছের তালিকায় এর নামও উঠে এসেছে। সম্প্রতি এ মাছের আমদানি করেছে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, যা উদ্বেগজনক বলে বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের মৎস্য সংগনিরোধ কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাস কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন (১৯৫০) এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী দেশীয় প্রজাতির মাছের জন্য হুমকিস্বরূপ বা ক্ষতিকর যেকোনো বিদেশি বা প্রজাতিবহির্ভূত মাছের আমদানি, কেনা-বেচা,পরিবহন ও চাষ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
এছাড়া ২০০৮ সালে পিরানহা মাছ এবং ২০১৪ সালে আফ্রিকান মাগুর, সাকার ফিসকে নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
অ্যাকুরিয়াম শোভাবর্ধন ব্যবহারিত কিছু সাকার অ্যালিগেটর মাছ মিশে গেলে দেশী শ্রেণির মাছের উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ধরনের মাছ আমদানি করার ব্যাপারে সর্তক রয়েছে।
মৎস্য চাষী অভিমত, সাকার ফিশ, স্নেক-স্কিন গুরামি, ক্রোকিং গুরামি, ও অ্যালিগেটর গার মত মাছের ব্যবসা, হ্যাচারি, আমদানি, পরিবহন ও বিক্রয় শুধু আইন করে নিষিদ্ধ করাই যথেষ্ট নয়; ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। এছাড়া নিষিদ্ধ মাছ ও ভয়ংকর অ্যাকুরিয়াম মাছের বিক্রি, প্রজনন, সরবার উপর নজরদারি করা উচিত মনে করেন মৎস্য সংশ্লিষ্টরা।
কালবেলা পত্রিকার সৌজন্যে
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।