১৮ অক্টোবর ২০২৬ · ঢাকা, বাংলাদেশ
এগ্রি বার্তা মাটির খবর, মানুষের কথা
উদ্যোক্তা

দুর্গাপুরে প্রথমবারের মতো ব্ল্যাক রাইস চাষ

ডেস্ক রিপোর্ট ১৮ অক্টোবর ২০২৬ · ৮ মিনিট পড়ার সময় · ১৯ বার পঠিত
শেয়ার করুন:
দুর্গাপুরে প্রথমবারের মতো ব্ল্যাক রাইস চাষ
ব্যতিক্রমী ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ‘ব্ল্যাক রাইস’ বা কালো চালের ধান। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে বিশেষ এই জাতের ধানের আবাদ।  নতুন এই ফসল ঘিরে স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ ও সম্ভাবনা। দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুর্গাপুর পৌরসভার দেবীপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা সোহান ১৬ কাঠা জমিতে এবং মাড়িয়া ইউনিয়নের পালি গ্রামের কৃষক আবু তালেব প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে এই ধান চাষ করছেন। আবু তালেবের মতো এই উপজেলার আরও কয়েকজন কৃষক এ জাতের ধান চাষ করেন। নতুন এই ফসলের চাষাবাদ, ফলন বৃদ্ধি ও বাজারজাতকরণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। জাগোনিউজ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, 

কৃষকদের প্রত্যাশা, পরীক্ষামূলক এই আবাদ সফল হলে দুর্গাপুরের আরও অনেক কৃষক ব্ল্যাক রাইস চাষে আগ্রহী হবেন। এতে প্রচলিত ধানের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বিকল্প জাতের আবাদ বাড়বে এবং কৃষিতে নতুন বৈচিত্র্য তৈরি হবে। কৃষক আবু তালেব বলেন, ব্ল্যাক রাইস আমাদের এলাকায় একদমই নতুন। তাই ঝুঁকি না নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে আড়াই বিঘা জমিতে চাষ করেছি। ফলন ভালো হলে এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে লাভবান হওয়া সম্ভব। এই উদ্যোগ সফল হলে আশপাশের অন্যান্য কৃষকরাও এ ধান চাষে আগ্রহী হবেন। তরুণ উদ্যোক্তা সোহান বলেন, নতুন ধরনের ধান চাষের প্রতি আমার আগ্রহ থেকেই ব্ল্যাক রাইসের আবাদ শুরু করেছি। প্রচলিত ধানের তুলনায় এর বাজারদর ভালো বলে জানতে পেরেছি। তবে আমাদের এলাকায় এটি নতুন হওয়ায় চাষাবাদের অভিজ্ঞতা অর্জন করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। ফলন ও বাজারদর সন্তোষজনক হলে ভবিষ্যতে আরও জমিতে এ ধান চাষের পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষক সোবহান আলী বলেন, ধানের নতুন জাত নিয়ে আমরা সাধারণত একটু চিন্তায় থাকি। কারণ ফলন কেমন হবে এবং বিক্রি করতে সমস্যা হবে কি না-এগুলো বড় বিষয়। তবে ব্ল্যাক রাইসের ফলন ও বাজারদর ভালো হলে এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক বিকল্প ফসল হতে পারে। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘায় ১৬ থেকে ১৮ মণ ধান উৎপাদন হতে পারে। বাজারে প্রতি মণ ধানের সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ৪ হাজার টাকা ধরা হলে বিঘাপ্রতি আয় হতে পারে প্রায় ৬৪ থেকে ৭২ হাজার টাকা। তবে উৎপাদন খরচ বাদ দিলে প্রকৃত মুনাফা নির্ভর করবে চূড়ান্ত ফলন ও বাজারদরের ওপর।

কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা রফিকুল হেলালী বলেন, ব্ল্যাক রাইসের চাষাবাদে কৃষকদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নতুন জাত হওয়ায় শুরুতে চাষিদের বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জমির পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক সময়ে ফসল কাটার বিষয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী বলেন, দুর্গাপুরে প্রথমবারের মতো ব্ল্যাক রাইসের আবাদ কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। নতুন ও সম্ভাবনাময় ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। এবারের ফলন, খরচ ও বাজারের চাহিদা পর্যালোচনা করে পরবর্তীতে আবাদের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পৌরসভা ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ এবং পালি ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুমিনুজ্জামানের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ব্ল্যাক রাইসের ক্ষেত পরিচর্যা করা হচ্ছে। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্ল্যাক রাইসে ‘অ্যান্থোসায়ানিন’ নামের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রঞ্জক উপাদান থাকায় চালের রং কালো বা গাঢ় বেগুনি দেখায়। এতে খাদ্যআঁশ ও প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ থাকায় বিশ্বজুড়ে এর আলাদা কদর রয়েছে। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছেও এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। তবে এর বাণিজ্যিক সফলতা মূলত সঠিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, দুর্গাপুরে প্রথমবারের মতো ব্ল্যাক রাইসের আবাদ কৃষকদের মধ্যে নতুন ধরনের ফসল চাষের আগ্রহ তৈরি করেছে। প্রচলিত ধানের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় জাতের আবাদ কৃষকের আয় বাড়ানোর একটি সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে। তবে নতুন জাতের ক্ষেত্রে ফলন, উৎপাদন খরচ, রোগবালাই এবং বাজারজাতকরণ-সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ধীরে ধীরে আবাদ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, কৃষিতে নতুন ও উচ্চমূল্যের ফসলের সংযোজন কৃষকের আয় ও কৃষির বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্ল্যাক রাইসের ক্ষেত্রে উৎপাদনের পাশাপাশি এর বাজার ব্যবস্থাপনাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু বাজারদর বেশি হলেই কৃষক লাভবান হবেন-এমনটি নয়; উৎপাদন খরচ, ফলনের স্থায়িত্ব, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিশ্চিত ক্রেতা-সব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের মধ্যে এ চালের চাহিদা তৈরি করা গেলে এটি একটি নির্দিষ্ট বাজার তৈরি করতে পারে। তবে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের আগে স্থানীয় পর্যায়ে ফলন ও লাভ-ক্ষতির হিসাব যাচাই করে পরিকল্পিতভাবে এগোনোই হবে টেকসই কৃষির জন্য বেশি কার্যকর।

ডেস্ক রিপোর্ট

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।