বাকৃবির সাবেক শিবির নেতা: ‘ছাত্রলীগের অস্ত্রের মুখে দিতে পারিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ভাইভা’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি সম্প্রসারণ ও শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক ড. মো. লামিউর রায়হান। জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে বাকৃবিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন তিনি। তবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে অসাধারণ ফলাফল এবং স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হয়েও ছাত্রলীগের অস্ত্রের মুখে তৎকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ভাইভায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি তিনি। এমনকি ছাত্রশিবির করার জন্য তার হাত, পা ও কলারের হাড় ভেঙে দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
ছাত্রলীগের নির্যাতন ও বর্তমান সরকারি চাকুরীর ভেরিফিকেশন নিয়ে দীর্ঘ আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন ছাত্রশিবিরের বাকৃবি শাখার সাবেক ছাত্রনেতা।
তিনি বলেন, ‘আমি ইসলামী ছাত্রশিবিরের বাকৃবি শাখার শিক্ষা সম্পাদক ছিলাম। সেই পরিচয়ের কারণে বারবার নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়েছি। একটি বৈধ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম, তাই আমার হাত-পা ও কলারের হাড় ভেঙে ফেলেছিল ছাত্রলীগের ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীরা। সেই নির্যাতনের ক্ষত আজও বয়ে নিয়ে বেড়াই। হলে একটা বছরও ভালোভাবে থাকতে পারিনি। আহত করে এক কাপড়ে বের করে দিয়েছিল। এমনকি সব সার্টিফিকেট পর্যন্ত রেখে দিয়েছিল। শখের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি পুড়িয়ে দিয়েছিল, শখের বাইসাইকেল বিক্রি করে দিয়েছিল। একটা শার্ট-প্যান্ট পর্যন্ত নিতে দেয়নি। ‘
তিনি আরও বলেন, ‘ঠিকভাবে ক্লাস করতে পারিনি। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করাও কষ্টকর ছিল। এমনকি কয়েকটা ক্লাস টেস্ট দিতেই পারিনি, যা অবশ্য সম্মানিত শিক্ষকেরা পরে নিয়েছিলেন। ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছি হাত পা ভেঙে আহত হয়ে বেডে শুয়ে। এভাবে এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে, ভীষণ কষ্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে, আল্লাহর রহমতে ডিগ্রি শেষ করেছি, স্বর্ণপদক নিয়ে। তবে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ভাইভা পর্যন্ত অস্ত্রের মুখে আমাকে দিতে দেয়নি ছাত্রলীগ, যা নজিরবিহীন।
বিএনপি ও জামায়াতের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকলেই ক্যাম্পাসে যাওয়া যেত না। ছাত্রলীগ খুঁজে বেড়াত মারধর করার জন্য। পুলিশের নামে কাজ করা আওয়ামী বাহিনীর সদস্যদের অত্যাচারে পালিয়ে থাকতে হতো। মামলা হয়েছে। এই বাড়ি, ওই বাড়িতে থেকেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারীর ধানখেতে শ্যালো মেশিনের ঘরে রাত কাটিয়েছি, যেখানে বাইরে থেকে তালা মেরে যেতেন তিনি। কোচিংয়ের ছাত্রছাত্রীদের বাসায় রাত কাটিয়েছি।’
নিজের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ কেড়ে নেয়ার আক্ষেপ আর নির্মম অভিজ্ঞতা ড. রায়হানকে ব্যাথিত করে বর্তমান চাকুরীপ্রত্যাশীদের ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া দেখে। তিনি বলেন, ‘মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে অনেক প্রার্থী বিসিএস, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ইত্যাদি পরীক্ষায় সফল হওয়ার পরও রাজনৈতিক পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট কিছু কারণে ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন। এটা দেখে আমি ভীষণ মর্মাহত হয়েছি। মজলুম সংগঠন বিএনপি জনগণের নির্বাচিত সরকার, আমাদের সরকার। একটি রক্তস্নাত ঐতিহাসিক বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত পরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসা নির্বাচিত সরকার। আমরা চাই, এই সরকার সফল হোক, মানুষের অধিকার রক্ষা করুক এবং আমাদের এত ত্যাগের মর্যাদা রাখুক।
আমি চাই না, এই দেশে আর কখনো কারও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার ওপর নির্যাতন করা হোক। কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হোক, কাউকে তার বাক স্বাধীনতার জন্য জুলুমের সম্মুখীন করা হোক, কারো কথা বলবার অধিকার কেড়ে নেওয়া হোক। ছাত্রশিবির কিংবা অন্য কোনো ছাত্রসংগঠন, এমনকি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সঙ্গে অতীতে সম্পৃক্ত ছিলেন, এমন কারও সঙ্গেও কোনো অন্যায় করা হোক, তাকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হোক, এটা আমি চাই না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিসিএস কর্মকর্তা, বিচার বিভাগ কিংবা রাষ্ট্রের সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগসহ যেকোনো ক্ষেত্রে কারও প্রতি জুলুম করা হোক, বৈষম্য করা হোক, দুর্নীতি করা হোক, এটা আমি চাই না। কেউ যদি কোনো ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে, এখনো নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম করে, গণহত্যার সমর্থন দেয়, অতীতে কারও ওপর জুলুম করে থাকে কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধ করে থাকে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অভিযোগের তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী বিচার হতে হবে। কিন্তু অন্য কাউকে কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা সম্পৃক্ততার কারণে জুলুম করা যাবে না। তাহলে আমাদের সব অর্জন ব্যর্থ হয়ে যাবে। ভিন্নমতের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি এই যে জুলুম করা হয়, এই যে জঘন্য কাজটি করা হয়, তা সবচেয়ে বেশি হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে। আর তা এখনো মারাত্মকভাবে চলমান। ক্ষমতাসীন সংগঠনের সঙ্গে না থাকলে, ব্যক্তি ও তাঁর পরিবার ক্ষমতাসীন রাজনীতির বলয়ের বাইরে হলে, যত ভালো ফলাফলই থাকুক, যত যোগ্যতাই থাকুক, তাঁদের শিক্ষক হতে দেওয়া হয় না। এমনকি তাঁদের মাস্টার্সের সুপারভাইজার শিক্ষক ভিন্নমতের হলেও তাঁদের শিক্ষক হতে দেওয়া হয় না। এই জঘন্য, জংলি নিয়ম এখনো বিরাজমান। এটি মেনে নেওয়া যায় না। শিক্ষা ও গবেষণার পবিত্র প্রাঙ্গণে এটি কীভাবে সম্ভব, প্রশ্ন তোলেন ড. রায়হান।
পাশাপাশি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আলোকে, জুলাইয়ের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে একটি ন্যূনতম মানবিক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগের আহবান জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, বাকৃবি
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।