উল্লাপাড়ায় অভয়াশ্রমে চলছে মাছ নিধণ
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ঘাটিনা রেল সেতুর পাশে করতোয়া নদীতে অভয় আশ্রমের পাশে বড়শি ও চায়না দোয়ারি জাল দিয়ে অবৈধভাবে মাছ শিকার করা হচ্ছে। মাছ শিকারিরা রাতের বেলায় কৌশলে রেল সেতুর পাশ থেকে পার্শ্ববর্তী সড়ক সেতু পর্যন্ত অংশে জাল ফেলে বাঁশের খুঁটি পুতে দড়ি দিয়ে জালগুলোর এক মাথা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখছে। পর দিন ভোরে সবার অলক্ষ্যে নৌকা নিয়ে খুঁটি থেকে জাল খুলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বের করে নিয়ে আবারও একইভাবে জাল ফেলে রাখছে। খুঁটিগুলো এমনভাবে পোতা হচ্ছে যাতে খুঁটির মাথা এবং পানির উপরিভাগের স্তর সমান হয়। ফলে দূর থেকে জাল ফেলার বিষয়টি কেউ সহজে বুঝতে পারে না। উপজেলা মৎস্য বিভাগ ঘাটিনা রেল সেতু ও সড়ক সেতুর মাঝে প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশে প্রতিবছর মাঝের অভয়াশ্রম তৈরি করে। মাঝে মাঝে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে মৎস বিভাগ অভিযান চালালেও তা তেমন কাজে আসছে না। উপযুক্ত লোকবলের অভাবে অভয়াশ্রমে সার্বক্ষণিক নজরদারি সম্ভব নয়। বছরে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার মাছ অবৈধভাবে শিকার করা হয় বলছে উপজেলা মৎস্য অফিস।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি জানান, বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ মাছ শিকারিদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। তারা মাছের অভয়াশ্রমের পাশে নদীতে কখনও বড়শি আবার কখনও চায়না দোয়ারি জাল ফেলে রুই, কাতল, চিতল, ফলি, কালবাউস, বোয়াল, মিরকাসহ দেশীয় বড় আকারের মা মাছ ও ছোট মাছ শিকার করে নিচ্ছে। আর এতে অভয়াশ্রমে মাছের প্রজনন এখন হুমকির মুখে পড়েছে। যেকোনভাবে অবৈধ মৎস্য শিকার বন্ধ না করা হলে উপজেলা মৎস্য বিভাগের অভয়াশ্রম তৈরির উদ্দেশ্য ভেস্তে যাবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধনে এলাকার ৩ জন অবৈধ মৎস্য শিকারির নাম পাওয়া গেছে, এরা হলেন, উপজেলার করতোয়া নদী সংলগ্ন বড় লক্ষ্মীপুর গ্রামের আব্দুল হালিম ও খোদাবক্স প্রামানিক এবং লক্ষ্মীপুর গ্রামের জাকারিয়া হোসেন।
বড় লক্ষ্মীপুর গ্রামে গিয়ে আব্দুল হালিম ও খোদাবক্স প্রামানিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদেরকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তবে মোবাইল ফোনে কথা হয় আব্দুল হালিমের সঙ্গে। তিনি করতোয়া নদীতে উপজেলা মৎস্য বিভাগের তৈরি অভয়াশ্রমে অবৈধভাবে মাছ শিকারের কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, মৎস্য দপ্তরের অভিযানে কিছুদিন আগে ধরা পড়ায় তিনি আর এ এলাকায় অবৈধভাবে মাছ ধরবেন না বলে মৎস্য বিভাগকে মুচলিকা দিয়েছেন। এরপর তিনি অভয়াশ্রম এলাকায় আর মাছ শিকার করেন না। তবে তার এলাকার অন্য কেউ মাছ শিকার করেন কি না জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মোবাইল ফোনে কথা হয় খোদাবক্স প্রামানিকের সঙ্গে। তিনি জানান, এ বছর এপ্রিল মাসে তিনি কয়েক দফায় বড়শি দিয়ে অভয়াশ্রমে মাছ ধরেছেন। কাঁচা মাছ ধরার লোভ সামলাতে না পেরে তিনি অভয়াশ্রমে বড়শি ফেলতেন। অনেক দিন ২ থেকে ৩ হাজার টাকার মাছ তিনি ধরতেন। কিন্তু উপজেলা মৎস দপ্তর থেকে এখানে অভিযান পরিচালিত হলে তিনি ধরা পরেন। পরবর্তীতে তার বড়শি ও মাছ ধরার সামগ্রী কেড়ে নেওয়া হয়। পরে ক্ষমা চেয়ে পার পান। এখন তিনি আর মাছ ধরেন না এবং ধরবেনও না বলে অঙ্গকার করেন। অপর দিকে লক্ষ্মীপুর গ্রামের জাকারিয়া হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান জানান, প্রতিবছর করতোয়া নদীতে ঘাটিনা রেল সেতু এবং সড়ক সেতুর মাঝে গভীর অংশে দেশীয় মাছের প্রজনন বৃদ্ধির জন্য লক্ষ্যধিক টাকা খরচ করে মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করা হয়। কোঞ্চিসহ বড় বড় বাঁশ নদীতে পোতা হয়। সেই সঙ্গে তেঁতুলের ডাল ফেলে নদীর গভীর অংশে মাছদের নিরাপদ অবস্থানের পরিবেশ তৈরি করা হয়। যাতে করে দেশীয় রুই, কাতল, কালবাউস, বোয়াল, চিতলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মা মাছগুলো এখানে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে ডিম ছাড়তে পারে এবং প্রজনন বৃদ্ধি করতে পারে। কিন্তু অসাধু ও লোভী মৎস্য শিকারিরা অবৈধভাবে বড়শি বা চায়না দুয়ারি জাল ফেলে বিশেষ করে মা মাছগুলো নিধণ করছে। এতে দেশের মৎস্য প্রজনন হুমকির মুখে পড়েছে। তার দপ্তরে লোকবল খুব কম। তার পরেও প্রতিবছর করতোয়া নদীতে অন্তত ১৫ বার অবৈধ্য মৎস্য নিধণ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভয়াশ্রমে সার্বক্ষণিক তদারকির লোক নিয়োগ দিতে না পারলে মৎস্য নিধণ বন্ধ কঠিন। প্রতিবছর অন্তত ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার মাছ অবৈধভাবে মেরে নেওয়া হয় এখান থেকে। আতাউর রহমান আরও জানান, উল্লিখিত এলাকার মানুষজন দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষনে মোটেও আন্তিরিক নন। এ মাসেই নতুন করে ওই নদীতে অভিযান পরিচালনা করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয়দের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন এই মৎস্য কর্মকর্তা।
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।