২১ আগস্ট ২০২৬ · ঢাকা, বাংলাদেশ
এগ্রি বার্তা মাটির খবর, মানুষের কথা
মৎস্য

বিপন্ন প্রজাতির গোটালী মাছের সফল কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন

এগ্রিবার্তা ডেস্ক ২৭ মে ২০২৫ · ৫ মিনিট পড়ার সময় · ১ বার পঠিত
শেয়ার করুন:
বিপন্ন প্রজাতির গোটালী মাছের সফল কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন

এক সময় ভোজনরসিকদের পাতে নিয়মিত দেখা যেত যে ছোট মাছটি, সেটি ছিল ‘গোটালী’। স্বাদে অতুলনীয় এই দেশি মাছটি দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক জলাশয়ে পাওয়া যেত, বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায়। তবে নানা পরিবেশগত ও মানবসৃষ্ট কারণে মাছটি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। এমন অবস্থায় দেশের বিজ্ঞানীদের চেষ্টায় নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে গোটালী। নীলফামারীর সৈয়দপুরে বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) স্বাদু পানি উপকেন্দ্রের গবেষকরা মাছটির কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদনে সফল হয়েছেন।

বৈজ্ঞানিক নাম Crossocheilus latius এবং Cyprinidae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই মাছটি ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা আইইউসিএন কর্তৃক বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়। এরপর থেকেই বাংলাদেশ সরকার ও বিএফআরআই এর সংরক্ষণে সক্রিয় হয়। মূলত জলাশয়ের দূষণ, কারেন্ট ও চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার, বৈদ্যুতিক শিকার, ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে এই প্রজাতির প্রাকৃতিক প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল।

গবেষণার নেতৃত্বে থাকা প্রিন্সিপাল বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আজহার আলী জানান, মাছটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টাটকিনি বা কালা বাটাও নামে পরিচিত। মাথা চ্যাপ্টা ও পেট সরু গঠনের মাছটির দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১০ সেন্টিমিটার ও ওজন গড়ে ১৫ থেকে ১৭ গ্রাম হয়ে থাকে। এটি এক সময় তিস্তা, বুড়ী তিস্তা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, সিলেট ও আশপাশের ঝর্নাধারায় পাওয়া যেত।

বিএফআরআই-এর গবেষক দল ২০২৩ সাল থেকে প্রজনন সংরক্ষণ গবেষণার আওতায় তিস্তা নদী থেকে সংগৃহীত পাঁচ-ছয় গ্রাম ওজনের কিছু নমুনা মাছ সংগ্রহ করে। এক বছর ধরে সেগুলোকে গবেষণা পুকুরে পর্যবেক্ষণ করে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর সিনথেটিক হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে মাছগুলোকে প্রজননের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

জুলাই-আগস্ট মাসে, অর্থাৎ প্রজনন মৌসুমে, হ্যাচারির কংক্রিট ট্যাংকে রেখে হরমোন ইনজেকশনের আট থেকে দশ ঘণ্টার মধ্যেই স্ত্রী মাছ ডিম ছাড়ে এবং পুরুষ মাছ তা নিষিক্ত করে। এরপর বিশেষভাবে প্রস্তুত ডিমগুলো থেকে পোনা ফুটিয়ে তোলা হয়। পোনাদের প্রাথমিকভাবে ডিমের কুসুম ও গরম পানির মিশ্রণ খাওয়ানো হয় এবং কয়েক ঘণ্টা পর নার্সারিতে স্থানান্তরিত করা হয়। প্রায় ৪৫-৬০ দিনের মধ্যে পোনাগুলো পাঁচ থেকে ছয় সেন্টিমিটার আকারে পরিণত হয় এবং সেগুলো পুকুরে ছেড়ে দিলে ৬৫-৭০ শতাংশ পোনা বেঁচে থাকে।

এই গবেষণায় অংশ নেন ড. আজহার আলী ছাড়াও ড. সোনিয়া শারমিন, মালিহা হোসেন মৌ, শ্রীবাস কুমার সাহা ও মো. আবু নাসের। তাঁরা সবাই বিএফআরআই-এর বিভিন্ন ধাপের গবেষক।

গবেষণা সফল হওয়ায় ড. আজহার আলী জানান, কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত এই পোনা দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এতে সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারিগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে গোটালী চাষের পথ খুলে যাবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন বিপন্ন প্রজাতির টিকে থাকা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যাবে।

এর আগেও এই প্রতিষ্ঠান ২০১৭ সালে বিপন্ন নেটিভ ট্যাংরা মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদনের কৃতিত্বে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। গোটালী মাছ নিয়ে এই সফলতা বাংলাদেশের মৎস্য খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এগ্রিবার্তা ডেস্ক

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।