চার দশকে ছয়বারের ভয়াবহ বন্যায় ২০২৪ সালেই মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি
বাংলাদেশ গত চার দশকে ছয়বার ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০০৭ এবং চলতি ২০২৪ সাল অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি বন্যার পর দেশে মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তবে চলতি ২০২৪ সালে বন্যাপরবর্তী মূল্যস্ফীতির হার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে যে, এই বন্যাই কি উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, বন্যার পাশাপাশি পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরবরাহ চেইনের পরিবর্তনও বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে। তারা মনে করছেন, 'মানবসৃষ্ট সংকট' মূলত মূল্যস্ফীতিতে বেশি প্রভাব ফেলেছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা জানান, বন্যায় ফসলের ক্ষতির কারণে ডলার সংকটের কারণে আমদানির মাধ্যমে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ দুটি বন্যা বাংলাদেশে ঘটে। ১৯৮৭ সালে দেশের ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয় এবং বন্যার কারণে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৬.৩৭ শতাংশে। পরবর্তী বছর আবারও বড় আকারের বন্যা হয়, যেখানে প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয় এবং মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮.৪ শতাংশে।
১৯৯৮ সালে আরও একটি ভয়াবহ বন্যা ঘটে, যা দেশের ৬৮ শতাংশ এলাকা প্লাবিত করে এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই সময় মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে বন্যার কারণে মানুষের জীবনহানি কমেছে এবং সচেতনতা বেড়েছে। তবে সাম্প্রতিক বন্যায় উৎপাদন ব্যাহত হয়নি বলে তারা মনে করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালে আবারও বড় ধরনের বন্যা হয়, যা বাজার পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি চলে যায়।
চলতি বছরের আগস্টে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আবারও বন্যা দেখা দেয়, যা বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। অক্টোবরে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ১০.৮৭ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে হয়েছে ১২.৬৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এবারের পরিস্থিতিতে শুধু বন্যাকেই দায়ী করা ঠিক নয়; অন্যান্য মানবসৃষ্ট সংকটও এর জন্য দায়ী। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বন্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলেও আমদানির সংকট ও ডলার সংকটের কারণে পণ্যের সরবরাহ কমেছে।”
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যায় কৃষি ও অর্থনীতিতে চাপ পড়েছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য সংস্থান করতে পারছে না প্রতি ১০ জনের মধ্যে তিনজন।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মূল্যস্ফীতির পেছনে মানবসৃষ্ট সংকট বড় ভূমিকা পালন করছে। সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়।
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।