কুসিকের পানির নিচে খাদ্যভাণ্ডার
কুমিল্লা নগরীর ধর্মপুর এলাকায় জেলার প্রধান খাদ্য সংরক্ষণাগার। আট বছর ধরে স্থায়ী জলাবদ্ধতায় গুরুত্বপূর্ণ এই ভাণ্ডার। এরই মধ্যে আটটি গুদাম পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। অবশিষ্ট ছয়টি গুদাম নিয়েও আশঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বর্ষা মৌসুমে ভারি বৃষ্টিপাত হলে পানি ঢোকে গুদামে। এ ছাড়া বর্তমানে বিষাক্ত পানির জলাশয় আর লতাপাতায় গুদামঘরগুলোর চারপাশ পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে। এতে মালপত্র আনা-নেওয়াসহ প্রতিদিনের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের কারণে নষ্ট হচ্ছে গুদামে থাকা ধান, চাল ও গম।
প্রধান সড়কে বড় বড় গর্ত আর পানি জমে খাদ্য বহনকারী পরিবহন চলাচল প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রতিনিয়ত গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ যত্রাংশ নষ্ট হওয়ায় চালকরা মালপত্র পরিবহনে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। জমাট বাঁধা দূষিত পানিতে মালপত্র ওঠানামা করতে গিয়ে চর্মরোগসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন শ্রমিকরা। খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ একাধিকবার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনকে (কুসিক) লিখিত ও মৌখিকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হলেও আট বছরে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি তাঁরা।
জানা যায়, ১৯৫৮ সাল থেকে জেলার প্রধান খাদ্য সংরক্ষণাগার হিসেবে ধর্মপুরের গুদাম ব্যবহার হয়ে আসছে। সেখানে নতুন ও পুরনো মিলিয়ে ১৪টি গুদামে সাড়ে ১০ হাজার মেট্রিক টন ধান, চাল ও গম সংরক্ষণ করে আসছিল খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় এই ভাণ্ডার থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি খাদ্য সহায়তা এবং সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, আসনারসহ জেলার বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের রেশন সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে এই গুদামে খাদ্য ধারণক্ষমতা ছয় হাজার মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। জলাবদ্ধতা আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে নষ্ট হচ্ছে গুদামে সংরক্ষিত খাদ্যশস্য।
২০১৭ সালে হঠাৎ করে নগরীর বাগিচাগাঁও, অশোকতলা, রানীর বাজার, বিসিক শিল্পনগরীসহ আশপাশের এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে অশোকতলার বাসিন্দারা। এরপর গুদামের পশ্চিম পাশে পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথটিও বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল রেললাইন উন্নীতকরণের পর। এতে আশপাশের আবাসিক এলাকা ও সিটি করপোরেশনের ড্রেনের দূষিত পানি এবং বৃষ্টির পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হতে শুরু হয়। বারবার এ সমস্যা সমাধানে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও মেলেনি কোনো সমাধান। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে গত আট বছরে আটটি গুদাম পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের জুন মাসে মাত্র তিন দিনের মাঝারি বৃষ্টিতে ৫০০ মেট্রিক টনের আরো একটি গুদামের নিচ থেকে পানি ওঠায় খাদ্যশস্য অন্যত্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্যগুদাম সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মকর্তা জানান, বর্ষা মৌসমে বাসা থেকে আসার সময় সঙ্গে লুঙ্গি-গামছা রাখতে হয়। কারণ অফিসে এসে হাঁটুসমান নোংরা পানিতে নেমে শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করতে হয়। এতে চর্মরোগসহ নানা ধরনের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তাঁরা। কুমিল্লার ধর্মপুর খাদ্যগুদাম সংরক্ষণ ও চলাচল কর্মকর্তা কামরুন নাহার বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের প্রবাহিত পানি ও রেলপথ নির্মাণের ফলে নিচ দিয়ে নিষ্কাশনব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আট বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছি আমরা। গ্রীষ্ম মৌসুমে পানি কিছুটা কম থাকলেও বর্ষায় এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুণ্ডু বলেন, ‘জলাবদ্ধতা সিটি করপোরেশনের সৃষ্টি। তাদের যাবতীয় পানি এখানে প্রবেশ করে, কিন্তু বের হওয়ার কোনো জায়গা নেই।’
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন বলেন, ‘খাদ্যগুদামসহ আশপাশের এলাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।