২৪ আগস্ট ২০২৬ · ঢাকা, বাংলাদেশ
এগ্রি বার্তা মাটির খবর, মানুষের কথা
কৃষি

সোনাগাজীর সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে কৃষি বিপর্যয়

এগ্রিবার্তা ডেস্ক ২৬ মে ২০২৫ · ৫ মিনিট পড়ার সময় · ১ বার পঠিত
শেয়ার করুন:
সোনাগাজীর সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে কৃষি বিপর্যয়

সোনাগাজী উপজেলার আদর্শ গ্রাম ও চর চান্দিয়ার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল একসময় ছিল সবুজ শস্যভরা জমি। ধান, তরমুজ, নানা ধরনের সবজির আবাদ হতো এখানে। বর্ষাকালে মাছ ধরার মৌসুমে কোটি টাকার মাছ আহরণ করতেন স্থানীয়রা। চরজুড়ে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতো গরু-মহিষ। আজ সেই চর পরিণত হয়েছে একটি বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে, যার আলো ছড়ানোর বদলে স্থানীয়দের জীবিকা ও আশা কেড়ে নিয়েছে।

২০২১ সালে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে উৎপাদনে আসা ৭৫ মেগাওয়াটের এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মিত হয়েছে ১,০০০ একর জমি জুড়ে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ (ইজিসিবি), চীনা দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায়। এতে ব্যয় হয়েছে ৭৫৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, যার অর্থায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ সরকার ও ইজিসিবি।

প্রকল্পের শুরুতে স্থানীয়দের জানানো হয়েছিল, এই প্রকল্প থেকে কর্মসংস্থান হবে বেকার যুবকদের। সিভি আহ্বানও করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে কেউই কাজ পাননি। "একজন দারোয়ানও স্থানীয় থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি," বলছেন স্থানীয়রা।

রহমত উল্লাহ সজীব, এক যুবক বলেন, “প্রকল্পের শুরুতে আমাদের লোভ দেখানো হয়েছিল, কিন্তু কিছুই হয়নি। সবটাই ছিল কাগুজে প্রতিশ্রুতি।”

চরাঞ্চলের কৃষক ও মৎস্যজীবীরা বলছেন, এখন তারা জমিতে চাষ করতে পারছেন না, গরু-মহিষ চরানোর জায়গা নেই, মাছ ধরাও নিষেধ। ইকবাল হোসেন হেলাল, এক কৃষক বলেন, “আমাদের এই গ্রাম আর আশপাশের ১০ হাজার পরিবার প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। এখন কিছুই করার নেই।”

আবদুল খালেক, এক সময়কার বাথান মালিক বলেন, “এই চরই ছিল আমার জীবনের মূল ভরসা। বর্ষায় কোটি টাকার মাছ ধরতাম, ধানও হতো শত শত টন। এখন সব শেষ।”

বর্তমানে আরও একটি ২২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে। এর জন্য আরও ৭০০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ২১৩৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

প্রকল্পের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রুবেল চন্দ্র দাস দাবি করেন, “পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।” কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। স্থানীয়দের অভিযোগ, চাষাবাদ, পশুপালন, এমনকি জীবনযাপনও এখন চরম সংকটে পড়েছে।

জোর-জবরদস্তি না থাকলেও অনেকেই বলছেন, পাশের জমিগুলো প্রকল্পে চলে যাওয়ায় তারাও বাধ্য হয়েছেন জমি দিতে। কবির আহম্মদ নামে একজন বলেন, “একটুকরো জমি ছিল, ধান হতো, গরু চরতো। আশপাশের জমিগুলো চলে যাওয়ায় আমাকেও দিতে হয়েছে।”

স্থানীয় গবেষক ফিরোজ আলম বলছেন, “এই চর হারানোয় শুধু কৃষি নয়, নদীর গতিপথও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও মাছের প্রজনন ক্ষেত্র।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সোনাগাজী উপজেলা সভাপতি শেখ আবদুল হান্নান বলেন, “এই প্রকল্পে একটি উর্বর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ক্ষতি অগণন। অথচ এখানকার কেউই প্রকল্প থেকে উপকৃত হয়নি। উৎপাদিত বিদ্যুৎও চলে যাচ্ছে অন্যত্র।”

তিনি আরও বলেন, “ভিন্নভাবে ভাবা যেত, ভবনের ছাদ, অনাবাদি জমি—এই সব জায়গাতেই এমন প্রকল্প হতে পারত। উর্বর কৃষিজমিতে এমন প্রকল্প একেবারেই অনুচিত।”

এগ্রিবার্তা ডেস্ক

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।