গাছ কমলেও লাভের সম্ভাবনা দেখছেন চাষিরা
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে আম মৌসুমি ফল হলেও আয়ের দিক থেকে তা সর্বাধিক লাভজনক কৃষিপণ্যগুলোর একটি। রাজশাহী অঞ্চল বিশেষ করে চারঘাট, বাঘা, পবা, গোদাগাড়ী ও পুঠিয়া-দুর্গাপুর আম উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল। এই অঞ্চলের আম মৌসুম ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার অর্থনীতি, যার মধ্যে স্থানীয় বাজার, আন্তঃজেলা সরবরাহ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতও অন্তর্ভুক্ত।
কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মৌসুমে রাজশাহী জেলায় প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে, যার ফলন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২ দশমিক ২০ লাখ মেট্রিক টন। প্রতি মণ আমের গড় বাজারমূল্য ১ হাজার ৫০০ টাকা ধরে হিসাব করলে শুধুমাত্র কাঁচাআম বিক্রি থেকেই রাজশাহীতে সৃষ্টি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বাজারমূল্য।
এদিকে ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, গোপালভোগ আম নামানো যাবে ২২ মে থেকে। লখনা (লক্ষণভোগ) ও রানীপছন্দ ২৫ মে থেকে, হিমসাগর ও খিরসাপাত ৩০ মে থেকে, ল্যাংড়া ও ব্যানানা ম্যাংগো ১০ জুন থেকে, আম্রপালি ও ফজলি ১৫ জুন থেকে, বারি-৪ আম ৫ জুলাই, আশ্বিনা ১০ জুলাই এবং গৌড়মতি ১৫ জুলাই থেকে, এছাড়া কাটিমন ও বারি আম-১১ জাতের আম পাকলেই নামাতে পারবেন চাষিরা।
রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার বাগানে আম নামাচ্ছিলেন চাষিরা। তারা জানান, আমাদের বাগানে এখন যেসব আম নামানো হচ্ছে, এর মধ্যে দেশীয় গুটি আম নামানো শুরু হলো। এবার যে সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে, তা সময়মতোই কার্যকর হওয়ায় আমাদের জন্য সুবিধা হয়েছে। গাছে আমও ভালোভাবে পেকেছে।
এসব আমকে অনেকেই আঁটি আমও বলেন। এই গুটি জাতের প্রায় ৩০০ রকমের আম আছে, যেগুলো অন্য জাতের চেয়ে আগেভাগেই পাকতে শুরু করে। চোষা বা চোরষা, বৈশাখী ও চাপড়া নামের গুটি আমও নামানো শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে বাজার ভালো, তবে বাগান কমে যাচ্ছে অপরিকল্পিত কৃষি ব্যবস্থাপনায়! পুঠিয়া উপজেলার চাষি গোলাম মোস্তফা জানান, ‘আমার বাগানে ৫০০টি আমগাছ আছে। এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। মাঝারি সাইজের আম হলেও মান ভালো। গুটি আম বিক্রি করেছি ১ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে। বর্তমানে দাম উঠেছে ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে। আশা করছি, এবার মোট লাভ ভালো হবে।’
কৃষি-অর্থনীতি গবেষকরা জানান, আমচাষ কেবল মৌসুমি আয়ের উৎস নয়, এটি একটি পুরো ‘অ্যাগ্রো-ইকোনমিক চেইন তৈরি করে। জমি কমে গেলে এই চেইনের শ্রমজীবী মানুষের আয়, জেলাভিত্তিক কৃষি প্রবৃদ্ধি, এমনকি জাতীয় পর্যায়ে ফল রপ্তানি আয়ে প্রভাব পড়বে।
অন্যদিকে এ আমের মৌসুমে তৈরি হয় কর্মসংস্থান, যা রাজশাহী জেলার প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ মানুষকে মৌসুমকালীন কাজের সুযোগ দেয়-চাষি পর্যায়ে চারা, সার, কীটনাশক, শ্রম, গাছের পরিচর্যা, সংগ্রহ ও পরিবহন: স্থানীয় শ্রমিক ও পরিবহন খরচ, বাজারজাতকরণ ও কমিশন: স্থানীয় পাইকার ও ফড়িয়া, সরবরাহ খরচ: আন্তঃজেলা পরিবহন, ঠেলাগাড়ি, ট্রাক, রেল ইত্যাদি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি।
রাজশাহীতে কিছু কোল্ড স্টোরেজ থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় কম। ফল সংরক্ষণের জন্য পরিবেশবান্ধব কোল্ড চেইন অবকাঠামো তৈরি না হলে রপ্তানির মতো উচ্চমানের আম প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হয় না। রাজশাহী জেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদপ্তর এ ব্যাপারে প্রকল্প গ্রহণ করলেও তা বাস্তবায়নের গতি ধীর।
তবে কিছু বেসরকারি কোম্পানি ইতোমধ্যে চুক্তিভিত্তিক আম সংগ্রহ শুরু করেছে। এতে চাষিরা সরাসরি বিক্রি করে কিছুটা সুবিধা পাচ্ছেন। টুবলু জানান, ‘আমাদের এলাকায় দু’একটা প্রক্রিয়াকরণ কোম্পানি এসেছে। তারা আগেই দরদাম করে নেয়, পরে নিজেরাই সংগ্রহ করে। এতে ঝামেলা কম হয়।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে ছালমা জানিয়েছেন, চাষিরা আম নামানো শুরু করেছেন। এই আম নামানো চলবে আগামী জুলাই মাস পর্যন্ত। এবার আশা করা যাচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।