২৪ আগস্ট ২০২৬ · ঢাকা, বাংলাদেশ
এগ্রি বার্তা মাটির খবর, মানুষের কথা
কৃষি

যশোরে প্রচণ্ড গরমে হ্যাচারিতে অক্সিজেন সংকট মারা যাচ্ছে মাছের রেণু

এগ্রিবার্তা ডেস্ক ১৯ মে ২০২৫ · ৭ মিনিট পড়ার সময় · ১ বার পঠিত
শেয়ার করুন:
যশোরে প্রচণ্ড গরমে হ্যাচারিতে অক্সিজেন সংকট মারা যাচ্ছে মাছের রেণু

চাঁচড়া এলাকা যশোরের মৎস্যপল্লী নামে পরিচিত। এ অঞ্চলের ৩৬টি হ্যাচারিতে রেণু ও চারা মাছ উৎপাদন হয়। হ্যাচারির পাশাপাশি যশোরে দুই-তিন হাজার মাছের নার্সারি রয়েছে। রেণু উৎপাদনের জন্য সাধারণত হ্যাচারির পানির স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরা হয় ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে প্রায় এক সপ্তাহ যশোরে গড় তাপমাত্রা ৩৯-৪০ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকের তুলনায় হ্যাচারির পানির তাপমাত্রা বাড়ায় দেখা দিয়েছে অক্সিজেন সংকট। এতে মারা যাচ্ছে রেণু ও চারা মাছ। তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন মৎস্যচাষীরা। তারা বলছেন, কয়েক দিনে তাদের প্রায় ১০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

মৎস্যচাষীরা বলছেন, যশোরে সাত-আটদিন ধরে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে হ্যাচারিগুলোর পানিও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। অক্সিজেন সংকটে রেণু ও চারা মাছ মারা যাচ্ছে। এ অবস্থায় অনেকে উৎপাদন বন্ধ রেখেছেন। আবহাওয়ার প্রতিকূল অবস্থা চলতে থাকলে রেণু উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

অবশ্য এ পরিস্থিতিতে জেলা মৎস্য বিভাগ থেকে জলাশয়ে প্রচুর পরিমাণে পানি দেয়া, কচুরিপানা-কলমি চাষ এবং পাড়ে কলা ও পেঁপে গাছ রোপণের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য বলছে, মাছের রেণু উৎপাদনে যশোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জেলায় ৩৬টি হ্যাচারিতে রেণু ও চারা মাছ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে কার্প জাতীয় রেণু উৎপাদন হয় প্রায় ৬৫ টন। জেলায় রেণুর চাহিদা রয়েছে ১৫ টনেরও বেশি। উদ্বৃত্ত ৫০ টন দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এছাড়া তেলাপিয়া পোনা, পাঙাশ, শিং, মাগুর, পাবদা, গুলসা, রুই, কাতল, মৃগেল, বিগহেড, থাই সরপুটি, কৈ, থাই কৈ মাছের রেণু উৎপাদন হয় যশোরের মৎস্যপল্লী চাঁচড়াতে। হ্যাচারির পাশাপাশি যশোরে দুই থেকে তিন হাজার মাছের নার্সারি রয়েছে। জেলার দুই লাখ মানুষ মাছ উৎপাদন, চাষ ও সংশ্লিষ্ট পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে।

হ্যাচারি মালিকরা জানান, দেশে রেণু পোনা উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে যশোর। সাধারণত ফাল্গুন মাস থেকে শুরু হয় রেণু উৎপাদনের মৌসুম। মধ্য আষাঢ় পর্যন্ত চলে রেণু উৎপাদন ও বিপণন। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ হচ্ছে রেণু ও চারা মাছ উৎপাদনের ভরা মৌসুম। যশোরে এক সপ্তাহ ধরে ৩৯-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বয়ে যাচ্ছে। এ তাপমাত্রায় চারা মাছ ও রেণু উৎপাদন করা সম্ভব নয়।

চাঁচড়া পোনা চাষী ও ব্যবসায়ী শাহজাহান হোসেন বলেন, ‘আমার দুটি পুকুর রয়েছে। দুটি পুকুরে সাদা মাছের পোনা উৎপাদন করা হয়। তাপপ্রবাহে পোনা উৎপাদন করতে পারছি না। প্রচণ্ড গরমে পানিও উত্তপ্ত হয়ে মাছের ডিম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

মাছচাষী জিএম আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, ‘তাপপ্রবাহের কারণে পুকুরের তলে গ্যাস তৈরি হয়ে পানি গরম হয়ে যাচ্ছে। ফলে পোনা মারা যাচ্ছে। গতকালও আমার দুই কেজি পরিমাণ বাটা মাছের চারা মারা গেছে।’

মাতৃ ফিশ হ্যাচারির মালিক জাহিদ গোলদার বলেন, ‘রেণু উৎপাদন মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া বেশ ভালো ছিল। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে তীব্র তাপপ্রবাহে রেণু উৎপাদন একেবারে কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে হ্যাচারিগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।’

রুপালি ফিশ হ্যাচারির মাসুদুল মণ্ডল বলেন, ‘গরমে মাছের অক্সিজেন ফেল করছে। আমাদের যতগুলো মোটর আছে সব চালিয়েও পানি ঠাণ্ডা করা সম্ভব হচ্ছে না। এত গরমে রেণু পোনা বাঁচানো সম্ভব নয়, যা বাঁচবে তাতে খরচ উঠবে না।’

রেণু উৎপাদনকারী নয়ন হোসেন জানান, চলতি সপ্তাহে ১২ কেজি রেণুতে মাত্র ২০ লাখ পোনা হয়েছে, যা স্বাভাবিকভাবে হয়ে থাকে ৩২ লাখ। যেভাবে গরম পড়ছে এভাবে কয়েক দিন থাকলে রেণু পোনা প্রায় সব মারা যাবে।

এ বিষয়ে যশোর জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির নেতা ফিরোজ খান বলেন, ‘তীব্র গরমের কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সহসা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে মৎস্য উৎপাদনে বিপর্যয় দেখা দেবে। যশোরের ৩৬টি হ্যাচারিতে বছরে দেড় লাখ কেজি রেণু উৎপাদন করা হয়, যার বাজার দাম প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।’

সার্বিক বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সরকার মুহাম্মদ রফিকুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যশোরে তাপপ্রবাহ চলছে। এ অবস্থায় পোনাচাষীদের হ্যাচারি বা ঘেরে প্রচুর পরিমাণে পানি দিতে হবে। পানির স্বাভাবিক তাপমাত্রা ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হবে। তাহলে পোনা উৎপাদনে সমস্যা হবে না।’

একই সঙ্গে জলাশয়ে কচুরিপানা ও কলমি চাষ এবং পাড়ে কলা ও পেঁপে গাছ রোপণের পরামর্শ দেন তিনি। মুহাম্মদ রফিকুল আলম বলেন, ‘কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত হলে বা তাপমাত্রা কমে গেলে রেণু উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে।’

এগ্রিবার্তা ডেস্ক

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।