৫০ কেজিতে এক মণ! কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে দালালচক্র
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি ৫০ কেজিতে এক মণ এমন নিয়মে যুগের পর যুগ ধরে পটুয়াখালীর চাষিরা মুগডাল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ থাকলেও প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরসহ স্থানীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর চুপ। ফলে ক্ষোভ, কষ্ট বুকে চেপে বৈষম্যের এই বাজারনীতি মেনেই ডাল বিক্রি করছেন কৃষক। আর এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে এক মুগডাল মৌসুমে কয়েক কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া বা দালালচক্র।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রায় ৬০ ভাগ মুগডাল উৎপাদন হয় পটুয়াখালী জেলায়। ফলে মুগডালের মৌসুম শুরু হলে মাঠে সক্রিয় হয়ে পড়ে ফড়িয়া এবং দালালচক্র। কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৫০ কেজিতে এক মণ ধরে ফড়িয়ারা মুগডাল কেনে। পরিমাপের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় ডিজিটাল পাল্লার পরিবর্তে সনাতনি দাড়িপাল্লা ব্যবহার করছে। বর্তমানে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকা মণ দরে ডাল কিনছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
সম্প্রতি সরেজমিনে পটুয়াখালীর গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, দশমিনা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুকিয়ে যাওয়া, পরিবহনের সময় ঘাটতির অজুহাতে ফড়িয়া, দালাল বা ব্যাপারীরা ৫০ কেজিতে এক মণ ধরে ডাল কিনে নিচ্ছে। এ চক্রের বাজারব্যবস্থা মেনেই তাদের মুগডাল বিক্রি করতে হচ্ছে।
গাইয়াপাড়ার কৃষক ইউনুচ শিকদার, কালাচাঁন পাড়ার রাহাত শিকদার, শামীম শিকদার, সোহরাব শিকদার, ইকবাল গাজী, বিপ্লব গাজী, আব্দুস সালাম গাজী, রঘু বয়াতি জানান, মুগডাল পাকার পর যখন শুকিয়ে ঝড়ঝড়ে হয়ে যায় তখন ক্ষেত থেকে তুলে বেশ কয়েক দিন প্রখর রোদে শুকানো হয়। এরপর মাড়াই করা হয়।
কৃষক রিয়াজ প্যাদা জানান, দেড় কানি জমিতে মুগডাল চাষ করে ৩২ মণ ডাল পেয়েছেন। এতে খরচ হয়েছে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা। ৪ হাজার ৭০০ টাকা মণ দরে ৩২ মণ ডাল বিক্রি করে রিয়াজ খরচ বাদে পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩০০ টাকা। অন্যদিকে ৩২ মণ ডালে ফড়িয়ারা বেশি নিয়েছে ৩২০ কেজি বা ৮ মণ ডাল। যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৭ হাজার ৬০০ টাকা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৮৮ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে মুগডালের চাষ হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ১ দশমিক ১৪ টন উৎপাদন ধরে জেলায় এক লাখ টনের বেশি মুগডাল উৎপাদন হয়েছে।
কৃষকদের দাবি, প্রতি টনে ৬ দশমিক ২৫ মণ ডাল লুটে নিয়ে যায় ফড়িয়া, দালালচক্র। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী টাকার অঙ্কে তা ২৯ হাজার ৩৭৫ টাকা। শুধু মুগডাল মৌসুমে গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, দশমিনা উপজেলায় উৎপাদিত প্রায় ৪২ হাজার টন মুগডাল থেকে ফড়িয়া, দালালচক্র লুটে নিচ্ছে প্রায় ৩ কোটি টাকার ৬ হাজার ২৫০ টন মুগডাল। একই চিত্র জেলার অন্য উপজেলায়ও।
মুগডালের মৌসুমি এ ব্যবসায় নেমে পড়েছেন কাপড় ব্যবসায়ী, ইউপি সদস্য, সচ্ছল কৃষক, রাজনৈতিককর্মী, মুদি ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, মোটরসাইকেল চালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। রাঙ্গাবালী, দশমিনা, গলাচিপার প্রতিটি ইউনিয়নে সক্রিয় রয়েছে এসব মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের অন্তত ৫০-৬০ জনের এক একটি চক্র। এসব দালাল বা ফড়িয়ারা কৃষকদের কাছে ব্যাপারী নামে পরিচিত। এরা গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের কাছ থেকে ডাল কিনে বিক্রি করছেন গলাচিপার আড়তদারদের কাছে। অনেক সচ্ছল ফড়িয়া বা দালালরা সরাসরি ঢাকার মোকামেও ডাল বিক্রি করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গলাচিপার মেসার্স গৌরাঙ্গ ভা-ারের মালিক রামু দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ অঞ্চলে ৪৮ কেজিতে মণ প্রচলিত। সেভাবেই কৃষক বিক্রি করছেন, আমরা ক্রয় করছি। আপনারা মোকামে কত কেজিতে বিক্রি করছেন এমন প্রশ্নের কোনো জবাব তিনি দেননি।
গলাচিপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজু আক্তার হতাশা প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বছরের পর বছর সিন্ডিকেট দ্বারা কৃষক প্রতারিত হলেও এ নিয়ে উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। বাজার মনিটরিংসহ মোবাইল কোর্ট চালুর জন্য ঊর্ধ্বতনদের বারবার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।