২৫ আগস্ট ২০২৬ · ঢাকা, বাংলাদেশ
এগ্রি বার্তা মাটির খবর, মানুষের কথা
কৃষি

শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর- কৃষি ও মৎস্য খাত চরম ঝুঁকিতে

এগ্রিবার্তা ডেস্ক ১২ মে ২০২৫ · ৫ মিনিট পড়ার সময় · ১ বার পঠিত
শেয়ার করুন:
শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর- কৃষি ও মৎস্য খাত চরম ঝুঁকিতে

এক সময় যেখানে পদ্মা, যমুনা, করতোয়া, হুরাসাগর, বড়াল কিংবা আত্রাইয়ের মতো নদনদী প্রবল স্রোতে বহমান ছিল, এখন সেখানেই দেখা যায় ধু-ধু বালুচর। নদীমাতৃক বাংলাদেশের বুকজুড়ে এখন শুষ্ক মৌসুমে দেখা যাচ্ছে পানিশূন্যতা, যা কেবল একটি জলবায়ুগত সমস্যা নয়—বরং নীতিনির্ভর একতরফা ভারতীয় পানি ব্যবস্থাপনার পরিণতি।

শাহজাদপুর উপজেলার পোরজনা ইউনিয়নের হুরাসাগর নদ দিয়ে একসময় কলকাতায় জাহাজ চলত। সেই নদেই আজ ডিঙি নৌকাও চলে না। পানি নেই, আছে শুধু বিস্তীর্ণ বালুচর। চর জেগে উঠেছে, সেখানে চলছে ফসল চাষ। অথচ এই নদীর বুকেই ছিল একসময় মৎস্য ভাণ্ডার, ছিল নৌকা বাইচ, খরা জাল, সেচের দাঁড়ের মতো গ্রামীণ ঐতিহ্য। এখন সবই অতীত।

ভারতের ফারাক্কা বাঁধসহ একতরফা বাঁধ ও ড্যাম নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের নদনদীগুলোর স্বাভাবিক গতি থেমে গেছে। স্রোতহীন এসব নদীর পানির স্তর ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরেরও নিচে নেমে গেছে। এতে করে শুধু যে নদীগুলো মরে যাচ্ছে তা নয়, শাখা নদী, খাল, বিল, জলাশয়ও শুকিয়ে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে গভীর ও অগভীর নলকূপের পানিও। সেচ ব্যবস্থায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ।

অথচ এই সংকট শুধু বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে না। এর মূলে রয়েছে প্রতিবেশী ভারতের মরুকরণমুখী পানি ব্যবস্থাপনা নীতি। তারা নিজেদের ভূখণ্ডে একতরফাভাবে বাঁধ ও পানি সংরক্ষণ করে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা অস্বীকার করছে। অথচ আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে সম্মিলিত ব্যবস্থাপনা ও পানি ভাগাভাগি বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত নীতি।

নদী যখন শুকায়, তার সঙ্গে মরে যায় প্রাণ। দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। মৎস্যজীবীরা হয়ে পড়ছেন কর্মহীন। নদীপাড়ের চাষিরা নিরুপায় হয়ে পড়ছেন জমি চাষে। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ শুধু কথা হয়ে রয়ে যাচ্ছে, বাস্তবতা আর আগের মতো নেই।

জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পানিসংকট একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু যদি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে পানির প্রবাহ থামিয়ে দেয়, তখন তা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটও বটে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইতোপূর্বে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বাপাউবো গঠিত হয়েছে, জাতীয় পানি নীতিমালা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভারতের নীতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে আমাদের অবস্থান এখনও দুর্বল। প্রশ্ন জাগে—যেভাবে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইল সমুদ্রসীমা অর্জন করেছে, ঠিক তেমনি পদ্মা-যমুনা-তিস্তা ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির হিস্যার জন্য আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়া কেন সম্ভব হচ্ছে না?

বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ার করছেন—এভাবে চলতে থাকলে শুধু নদী নয়, বাংলাদেশের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল রূপ নেবে 'মিনি মরুভূমি'তে। আজ প্রয়োজন শক্ত অবস্থান, সচেতন জনমত এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে জোরালো কূটনৈতিক পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের প্রাণ নদী—তাদের বাঁচাতে না পারলে, আমরা আমাদের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ—সবই হারাতে বসব।

এগ্রিবার্তা ডেস্ক

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।