কমছে আবাদি জমি, শঙ্কা কৃষিতে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে বাড়ছে বসতবাড়ি, কিন্তু কমছে ফসলি জমি। প্রশাসনিক হিসাবেই গত পাঁচ বছরে আবাদি জমি কমেছে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর। তবে কৃষক ও স্থানীয়দের মতে প্রকৃত হার এর দ্বিগুণ বা তারও বেশি। কৃষিজমি ভরাট করে বাড়িঘর ও পুকুর তৈরির এই প্রবণতা শুধু খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতেও ফেলছে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।
নাসিরনগরের কালিকুণ্ডা গ্রামের মন্নাফ মিয়া ও কালন মিয়া দুই ভাই মিলে একটি বিঘা আবাদি জমি ভরাট করে সেখানে ঘর তুলছেন। যৌথ পরিবারে এক ভিটায় দুই সংসার নিয়ে চলা কঠিন হওয়ায় তারা এই জমি বাড়ি নির্মাণে ব্যবহার করছেন। তাদের মতো অনেকেই জমি ভরাটের পেছনে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বাড়ার যুক্তি দেখাচ্ছেন।
কৃষি নির্ভর এ উপজেলায় ধান-পাটসহ মৌসুমি শস্য উৎপাদনে খ্যাতি থাকলেও, আজ সেই জমিগুলো অপ্রতিরোধ্যভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র বুড়িশ্বর ও গোকর্ণ ইউনিয়নে, যেখান থেকে সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদিত হতো, গত পাঁচ বছরে এক হাজার হেক্টরের বেশি জমি ভরাট হয়ে গেছে।
উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে অন্তত অর্ধশতাধিক এলাকায় খননযন্ত্র দিয়ে জমি ভরাট চলছে, যার পেছনে স্থানীয় দালাল ও কিছু ভূমি অফিসকর্মীর যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। কৃষকরা বারবার অভিযোগ করেও পাচ্ছেন না প্রশাসনের কার্যকর সাড়া।
নাসিরনগরের কৃষক মতিউর রহমান বলছেন, ‘জমি তো নাই, অন্যের জমিও দিন দিন কমতাছে। তাই আর কৃষি করে থাকা যায় না, শহরে চলে যেতে হচ্ছে।’ যুবক লোকমান হোসেন বলেন, ‘ধানের ন্যায্যমূল্য না থাকায় জমি ভরাট করে বিক্রি করাই একমাত্র বিকল্প।’
মেঘনার তীরে থাকা চাতলপাড়ের কৃষক আমান মিয়ার জমি কমেছে নদীভাঙনে। তাঁর মতে, ফসলি জমি হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ নদীর করালগ্রাস, যা প্রতিরোধে প্রয়োজন মজবুত বাঁধ।
উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাব মতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে উপজেলায় আবাদযোগ্য জমি ছিল ২৬ হাজার ২৫০ হেক্টর, যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৩২৬ হেক্টরে। ইউনিয়নভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি জমি হারিয়েছে গুনিয়াউক, ফান্দাউক, চাপড়তলা ও বুড়িশ্বর ইউনিয়ন।
তবে স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্যে এবং বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে বড় রকমের গরমিল। সহকারী কমিশনার (ভূমি) দাবি করছেন, তিনি নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন, কিন্তু জমি ভরাটের উৎস বন্ধ হচ্ছে না। আর সাধারণ মানুষের অভিযোগ, স্থানীয় ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তাই এই ভরাট কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছেন। এমনকি অনুমতি ছাড়াই অনেক জায়গায় নির্মাণ চলছে, যেগুলোর দায় কেউ নিতে চায় না।
জমির শ্রেণি পরিবর্তন, দালালদের দৌরাত্ম্য, ইটভাটার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, আবাসন সংকট, নদীভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সরকারি নজরদারির অভাব—সব মিলিয়ে কৃষিজমি আজ হুমকির মুখে।
জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি আব্দুন নূর বলেন, “এই জমি সংকট আমাদের ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জে ফেলবে। এখনই কার্যকর নীতিমালা, ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা নিতে হবে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসাইন মনে করেন, এখনই পদক্ষেপ না নিলে ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে, এবং কৃষিনির্ভর জনপদের খাদ্য ভাণ্ডার হয়ে পড়বে শূন্য।
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।