বাড়ছে তালের পাটালি গুড়ের চাহিদা
একসময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য পরিচিত ছিল পটুয়াখালী, বরগুনা ও পিরোজপুর। আজ সেই পরিচিতির পাশে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গৌরব—তালের পাটালি গুড়। উপকূলীয় বাংলার এই গুড় এখন শহরের বাজারেও পরিচিত এক স্বাদগন্ধের নাম, যেখানে মিশে আছে মাটির ঘ্রাণ, শৈশবের স্মৃতি, আর গ্রামীণ ঐতিহ্যের নিঃশব্দ গর্ব।
তালের রস থেকে তৈরি এই গুড়ের স্বাদ অনন্য। গাছ থেকে সংগ্রহের পর রস কয়েক ঘণ্টা জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় মসৃণ, চকচকে এক ধরনের পাটালি গুড়। এতে নেই কোনো কৃত্রিম সংরক্ষক বা রাসায়নিক। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এই মিষ্টান্ন শহরের প্যাকেটজাত চিনি বা ভেজাল গুড়ের ভিড়ে আজ এক বিশুদ্ধ ব্যতিক্রম।
বরগুনার আমতলী উপজেলার গুড় প্রস্তুতকারক মো. শামসুল হক বলেন, “ভোরে গাছে উঠে রস নামাই। সকালে চুলায় জ্বাল দিয়ে দুপুর নাগাদ তৈরি হয় গুড়। এতে ভেজাল বলে কিছু নেই। এজন্যই হয়তো স্বাদে এমন ভিন্নতা।”
ঢাকার খিলগাঁও এলাকার গৃহিণী সেলিনা রহমান বলেন, “এই গুড় আমি গ্রামের বাড়ি থেকে এনে পায়েস আর পিঠায় ব্যবহার করি। বাজারের গুড়ের মতো এতে কোনো ঝাঁঝ নেই। বরং দুধের সঙ্গেও অসাধারণ খেতে লাগে।”
এই গুড়ের স্বাদ শুধু জিভে নয়, স্মৃতিতে থাকে। অনেকেই বলেন—এক চিমটি পাটালি মুখে দিলেই যেন হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরে আসে। নরম, সুগন্ধি আর তুলতুলে এই গুড় শহুরে ভোক্তাদের মধ্যে তৈরি করেছে নতুন চাহিদা। উৎপাদনস্থল থেকে এই গুড় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৮০ টাকা কেজি দরে।
তবে সম্ভাবনার এই স্বাদপথে কিছু প্রতিবন্ধকতাও আছে। গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, প্রশিক্ষিত শ্রমিকের ঘাটতি এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে এখনো এই গুড় বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন বা রপ্তানি সম্ভব হয়নি।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কৃষক আজিজুল হক বলেন, “সরকার যদি আধুনিক যন্ত্রপাতি, সংরক্ষণ পদ্ধতি আর প্রশিক্ষণ দিতো, তাহলে অনেক বেশি গুড় তৈরি করা যেত। বিদেশেও পাঠানো সম্ভব হতো।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তালের পাটালি গুড় শুধু স্থানীয় নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও সম্ভাবনাময় একটি কৃষিপণ্য। পিরোজপুর চেম্বার অব কমার্স জানায়, এই গুড় যদি জিআই (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তাহলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এটি ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারে।
শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, তালের পাটালি গুড় বাংলার গ্রামীণ জীবনের গন্ধ, রঙ আর ঐতিহ্যের প্রতীক। সময় এসেছে এ গুড়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করার—ভালবাসা, পরিকল্পনা আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মিশেলে গড়ে তোলার এক মিষ্টি অর্থনীতির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ।
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।