ভোক্তার স্বস্তির বড় মূল্য দিতে হচ্ছে কৃষককে
দেশজুড়ে শীতকালীন সবজি চাষে চমৎকার ফলন হলেও কৃষকের মুখে নেই হাসি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারমূল্যের ব্যবধান এতটাই বেশি যে কৃষকরা লাভ তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যের খরচই তুলতে পারছেন না।
মানিকগঞ্জের কৃষক এস এম শহীদুল কবির লিপু আক্ষেপ করে বলেন, “ফুলকপি উৎপাদন করতে প্রতি পিসে খরচ ১০ টাকা, অথচ ক্ষেতেই বিক্রি করেছি ২ টাকায়। অথচ শহরে সেটা ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তাহলে আমি কী পেলাম?”
শুধু মানিকগঞ্জ নয়, খুলনার দাকোপ উপজেলার কৃষক আমিনুল হক বলেন, “প্রতি কেজি টমেটো উৎপাদনে খরচ ১০ টাকা, অথচ পাইকার ৪ কেজির দাম দেন ১০ টাকা। বাজারে নিয়ে গেলে কেজিতে ৩ টাকা খরচ, তাই বাধ্য হয়ে ক্ষেতেই রেখে দিচ্ছি।” অনেক ক্ষেত্রেই গাছেই পচে যাচ্ছে টমেটো।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর সবজির ফলন হয়েছে ব্যাপক। তবে এর সুফল পাচ্ছেন না উৎপাদকরা। কারণ, সরবরাহ বেড়ে গেলেও বাজারব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় দাম পড়েছে অনেক নিচে। এতে কৃষকের লোকসান হয়েছে ব্যাপক হারে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, রমজান মাসে প্রতি কেজি টমেটোর খুচরা দাম ১২ থেকে ১৫ টাকা হলেও যৌক্তিক মূল্য হওয়া উচিত ছিল ২৬ টাকা। একইভাবে কাঁচামরিচের ক্ষেত্রে যৌক্তিক মূল্য ছিল ৪৫ টাকা, বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকায়।
একজন কৃষকের উৎপাদিত ফসল ভোক্তার টেবিলে পৌঁছাতে কমপক্ষে তিন হাত ঘোরে—স্থানীয় ব্যবসায়ী, পাইকার এবং খুচরা বিক্রেতা। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে কম লাভ পান মূল উৎপাদক কৃষক।
একই চিত্র দেখা যায় আলু, মিষ্টিকুমড়া কিংবা বেগুনেও। অনেক সময় কৃষকের কেজিপ্রতি দাম ৯ টাকা হলেও ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে ২০-২২ টাকায়।
২০১৮ সালে কৃষিপণ্য বিপণন আইন এবং ২০২১ সালে বিধিমালা হলেও কার্যত এর প্রয়োগ নেই। এসব বিধিমালায় উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মুনাফার সীমা নির্ধারণ করা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। বাজার কমিটি আছে কেবল কাগজে-কলমে। সদস্যদের সঙ্গে কথা বললেও তারা বৈঠক বা কার্যক্রমের কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ড. মো. তাজউদ্দিন বলেন, “ভরা মৌসুমে বিশ্বের কোথাও সবজির দাম এতটা পড়ে না। কৃষক কী পরিমাণ কী জাতের ফসল ফলাবেন—এমন একটি গাইডলাইন সরকারের পক্ষ থেকে থাকা উচিত।”
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মানসম্মত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর ২০–৪৪% সবজি ও ফল নষ্ট হয়। যার অর্থমূল্য প্রায় ২৮,৮০০ কোটি টাকা।
সদাই নামে একটি অ্যাপ চালু হলেও তা পরীক্ষামূলকভাবেই আটকে আছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকের সঙ্গে এই প্রযুক্তির কোনো সংযোগ ঘটছে না।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে হিমাগার স্থাপন, কৃষি বীমা চালু এবং একটি স্বতন্ত্র মূল্য কমিশন গঠন করা জরুরি। একইসঙ্গে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে অধিকতর সক্রিয় করে তোলা দরকার।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “সরকারের উচিত চাষ ও চাহিদার তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা। না হলে কৃষি উৎপাদন ভালো হলেও কৃষক থাকবেন বিপদে।”
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।