শেরপুরে আলু সংরক্ষণ নিয়ে বিপাকে কৃষক, নতুন হিমাগার নির্মাণের দাবি
শেরপুরে কয়েক বছর ধরেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হচ্ছে। আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগারে নেই পর্যাপ্ত জায়গা। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চাষিরা। এই জেলায় ২টি সরকারি ও ১টি বেসরকারি হিমাগার থাকলেও চাহিদার তুলনায় জায়গা নিত্যান্তই অপ্রতুল। ফলে বাধ্য হয়েই কম দামে আলু বিক্রি করে লোকসান গুনছেন কৃষকরা। আলু সংরক্ষণের জন্য দ্রুত বড় আয়তনের হিমাগার স্থাপনের দাবি স্থানীয় কৃষকদের। শেরপুর কৃষি বিভাগের খামারবাড়ির অতিরিক্ত উপপরিচালক ( উদ্ভিদ সংরক্ষণ ) মো. হুমায়ুন কবির দৈনিক ইনকিলাবকে জানান, সবজি সংরক্ষণের জন্য একটি নতুন হিমাগার নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
উচ্চ পর্যায়ে একটি প্রতিবেদনও জমা দেয়া হয়েছে। প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে কৃষকদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে শেরপুরে ৫ হাজার ২১২ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কৃষকরা ৫ হাজার ৩১৭ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করেছেন। ৯৩ হাজার ৮১৬ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৯৫ হাজার ৭০৬ টন।
শেরপুরে সরকারিভাবে ২টি হিমাগার রয়েছে। যেখানে ১ হাজার ও ২ হাজার টন করে মোট ৩ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব। কিন্তু, তা চাহিদার তুলনায় নিত্যান্তই অপ্রতুল। জেলার একমাত্র বেসরকারি হিমাগার তাজ কোল্ড স্টোরেজে ১০ হাজার টন আলু সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও হিমাগারে প্রচন্ড চাপ পড়ায় কৃষকরা জায়গা পাচ্ছেন না।
অনেক কৃষক ট্রলি ও ট্রাকে আলু বোঝাই করে এনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে হিমাগারে জায়গা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কৃষকদের অভিযোগ, হিমাগারে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেকেই আলু সংরক্ষণ করতে পারছেন না। ফলে, বাধ্য হয়েই কম দামে আলু বিক্রি করছেন। এতে চাষের খরচও উঠছে না।
নকলা উপজেলার কৃষক গণি মিয়া বলেন, আলু ঘরে রাখলেই নষ্ট হয়ে যায়। আলুর দাম ও অনেক কম। বাধ্য হয়ে কম দামেই আলু বিক্রি করে দিলাম। কিছুদিন সংরক্ষণ করে রাখতে পারলে ভালো দাম পেতাম। ৫ ট্রলি আলু এনে ৪ দিন রাস্তায় বসে থেকেও হিমাগারে রাখতে পারিনি। শেরপুর সদর উপজেলার কৃষক ইসমাইল হোসেন বলেন, এবার ২০০ মণ আলু পেয়েছি। শুধু বীজ আলু সংরক্ষণ করতে পেরেছি।
বাকিগুলো বিক্রির উদ্যোগ নিলেও যে দাম বাজারে, সে দামে বিক্রি করলে লোকসান গুণতে হবে। কোল্ডস্টোরেজ আলু রাখতে পারলে লোকসান হতো না। বকসীগঞ্জ উপজেলার কৃষক আব্দুল হানিফ মিয়া বলেন, গত বছর কোল্ডস্টোরেজে জায়গা পেয়েছিলাম। সেজন্যই এবার বেশি আলু আবাদ করেছি। কিন্তু, এবার তো জায়গাই পেলাম না। এবার আমার একবারেই লস। নতুন একটা কোল্ডস্টোরেজ তৈরি হলে কৃষকদের অনেক উপকার হবে।
নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, আমি ৫০ বস্তা আলু সংরক্ষণের জন্য এসেছিলাম। ৩ দিন ঘুরেও হিমাগারে জায়গা পাইনি। গাড়ি ভাড়া দিয়েও অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে, কম দামে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই। সরকারি হিমাগারে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের খরচ ৬ টাকা ৭৫ পয়সা। বেসরকারি তাজ কোল্ড স্টোরেজে ৫ টাকা ৮১ পয়সা খরচে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণ করা যাচ্ছে।
সরকারি হিমাগারে জায়গার সংকট ও বেসরকারি হিমাগারে অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেকেই আলু সংরক্ষণ করতে পারছেন না। তাজ কোল্ডস্টোরেজের ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম বলেন, ধারণক্ষমতার তুলনায় আলু সংরক্ষণের চাহিদা বেশি। এ কারণে অনেক কৃষককে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। শেরপুর জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক বলেন, জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয়েছে। ফলে হিমাগারে সংরক্ষণের চাপ কিছুটা বেড়েছে। আমরা কৃষকদের বলতে চাই, তারা যেন ক্ষতির মুখে না পড়েন, সেজন্য স্বল্প মেয়াদে ২-৩ মাস বাড়িতে আলু সংরক্ষণ করতে পারেন। তবে, দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য হিমাগারে রাখা জরুরি।
আলু উৎপাদনের তুলনায় হিমাগারে জায়গা কম থাকায় কৃষকরা ঝামেলায় পড়েছেন। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। যতটুকু সম্ভব কৃষি বিভাগ থেকে সহযোগিতাও করে যাচ্ছি। শেরপুর বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক বিজয় কুমার দত্ত বলেন, এ জেলাতে একটি বেসরকারি হিমাগার আছে। সেটিও আমাদের বিসিকের ভেতরে। বেসরকারি পর্যায়ে আমরা প্রতিনিয়ত উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি নতুন হিমাগার করতে আগ্রহী হন। তবে আমরা তাকে অবশ্যই সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।