তাপপ্রবাহে ধানের ‘হিট শক’, কুয়াশায় আমের মুকুল ঝরে পড়ছে
রংপুর ও আশপাশের জেলাগুলোর কৃষকদের চোখে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। কারণ, দিনের প্রচণ্ড গরম আর রাতের ঘন কুয়াশার অস্বাভাবিক পরিবেশে ব্যাহত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন। কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু বৈচিত্র্যের কারণে বোরো ধানে ব্লাস্ট রোগের ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি আমের মুকুল ঝরে পড়ায় ফলন নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
পীরগঞ্জের কৃষক আর্জন আলী বলেন, ‘‘দিনে প্রচণ্ড রোদে বেগুনের পাতা পাকিয়ে যাচ্ছে, পটোল লাল হয়ে গেছে। ওষুধও কাজ করছে না। তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রির ওপরে থাকায় কীটনাশকের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’’
ধানক্ষেতে পানির অভাব ও পোকার আক্রমণে হতাশ লোকনাথ রায় বলেন, ‘‘পাতা কুঁচকে যাচ্ছে, পোকার আক্রমণ বাড়ছে, পানি দিয়েও ফল পাচ্ছি না।’’
কৃষিবিজ্ঞানী ড. মেহেদী মাসুদ বলেন, ‘‘বর্তমানে ধানে হিট শক, ব্লাস্ট রোগ, বাদামি গাছ ফড়িংয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। আবার আম গাছে ফাঙ্গাস সংক্রমণ, মুকুল ঝরে পড়া এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।’’
নওগাঁর আমচাষি নজরুল ইসলাম জানান, গাছে মুকুল এলেও আম ধরছে না। এমন অবস্থায় জমির মালিককে টাকা দেবেন কীভাবে তা নিয়েই চিন্তিত তিনি। একই সমস্যা সারাইগাছি গ্রামের আমচাষি ফয়জুল্লাহর ক্ষেত্রেও।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে হিটওয়েভ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। গরমে ধানে হিট শক থেকে বাঁচাতে জমিতে ৫–৭ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বসন্ত ও গ্রীষ্মে দিনে রোদের প্রখরতা এবং রাতে তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণত মরু অঞ্চলে ঘটে। এই পরিবর্তনের পেছনে দায়ী খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়া, বৃক্ষনিধন, ইটভাটা এবং অপরিকল্পিত বসতি।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মাহিউল কাদির বলেন, ‘‘অস্বাভাবিক জলবায়ুর কারণে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ১০–১৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এতে বাতাস ঘনীভূত হয়ে কুয়াশার মতো আবরণ তৈরি করছে, যা আসলে স্মগ—যার মধ্যে দূষণও মিশে আছে।’’
সেন্টার ফর পিপল অ্যান্ড এনভায়রন (CPE) এর পরিচালক মুহম্মদ আবদুর রহমান জানান, “এই স্মগে সালফার, নাইট্রোজেন অক্সাইডসহ ধুলাবালি মিশে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের বিষাক্ত পরিবেশ, যা কৃষির জন্য ভয়াবহ হুমকি।”
কৃষিবিদরা বলছেন, জলবায়ু সহনশীল চাষাবাদ ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারে এখনই পদক্ষেপ না নিলে দেশের কৃষি ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।