২৬ আগস্ট ২০২৬ · ঢাকা, বাংলাদেশ
এগ্রি বার্তা মাটির খবর, মানুষের কথা
কৃষি

কৃষিতে খরচ বাড়লেও মিলছে না প্রত্যাশিত দাম, ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন যশোরের চাষীরা

এগ্রিবার্তা ডেস্ক ৫ মার্চ ২০২৫ · ৬ মিনিট পড়ার সময় · ১ বার পঠিত
শেয়ার করুন:
কৃষিতে খরচ বাড়লেও মিলছে না প্রত্যাশিত দাম, ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন যশোরের চাষীরা

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে পাবনা ও যশোরের কৃষকদের কাছ থেকে। ধান ও সবজির অন্যতম উৎপাদন কেন্দ্র এই দুই জেলা। কিন্তু দিন দিন কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা না থাকায় কৃষকদের দুর্ভোগ বেড়ে চলেছে। পাবনার বেড়া উপজেলায় সেচ সমস্যার কারণে ধান চাষ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে যশোরের কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে লোকসানে পড়ছেন।

পাবনার বেড়া উপজেলায় বোরো মৌসুমে ধান চাষে এখন কৃষকরা নানা সমস্যার মুখে। সাধারণত খাল থেকে পানি নিয়ে সেচ সুবিধা পেতেন তারা, কিন্তু এবছর খালগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় গভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ দিতে বিঘা প্রতি ৫,০০০ টাকা খরচ হচ্ছে, যেখানে খাল থেকে সেচ নিতে খরচ হতো মাত্র ১৮০ টাকা। এতে করে কৃষকদের উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে, যা অনেকের জন্য ধান চাষকে অলাভজনক করে তুলেছে।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি সময়মতো খালে পানি সরবরাহ করত, তাহলে তাদের এই দুর্ভোগ পোহাতে হতো না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন, আগামী ১৩ মার্চ থেকে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে এবং কৃষকরা পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা পাবেন। কিন্তু ততদিনে অনেক কৃষকই হয়তো ধান চাষের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হবেন।

যশোর কৃষিপণ্যের জন্য বিখ্যাত জেলা হলেও বর্তমানে এখানকার কৃষকরা মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছেন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য মিলছে না। ফলশ্রুতিতে, অধিকাংশ কৃষক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

রাশেদ আলী নামে এক কৃষক আড়াই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে সবজি চাষ করেন। তার মিষ্টিকুমড়া বিক্রির জন্য তিনি বারিনগর মোকামে যান, কিন্তু পাইকাররা কেজি প্রতি মাত্র ১২ টাকা দাম দেন। অথচ উৎপাদন খরচ এত বেশি যে তিনি দেনা শোধ করতে পারছেন না।

পেঁয়াজ চাষি তাপস কুমার ঘোষ এক বিঘা জমিতে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা খরচ করেছেন, কিন্তু বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী তিনি তার অর্ধেক খরচও তুলতে পারবেন না। কৃষকদের ভাষায়, "ফসল বিক্রি করে ঋণের অর্ধেকও শোধ হচ্ছে না। গরু-ছাগল বিক্রি করে দেনা শোধ করতে হবে।"

কৃষকরা জানিয়েছেন, সার, কীটনাশক, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। এমনকি বর্গাচাষিদের ক্ষেত্রে জমির বর্গা খরচও বেড়েছে। ফলে চাষাবাদ লাভজনক থাকছে না।

সদর উপজেলার চাষি জামাল হোসেন তরফদার তিন বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন, যার জন্য খরচ হয়েছে প্রায় ৫০-৫৫ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী তিনি এক বিঘা জমির আলু মাত্র ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন, যা তার লোকসানকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, কৃষকদের বৈচিত্র্যময় ফসল চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। একই ফসল বেশি চাষ না করে বিভিন্ন ফসলের দিকে নজর দিলে লোকসানের ঝুঁকি কমে আসবে।

তিনি আরও বলেন, "সরকার সারে ভর্তুকি দিচ্ছে, কিন্তু কৃষি উপকরণের অন্যান্য খরচ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কৃষকদের সমস্যা থেকেই যাবে।"

একই সঙ্গে যশোরে সবজি সংরক্ষণের জন্য কোনো হিমাগার নেই, যা কৃষকদের জন্য আরেকটি বড় সংকট। তিনি জানিয়েছেন, সরকার পাইলট প্রকল্পের আওতায় হিমাগার তৈরির পরিকল্পনা করছে, যা বাস্তবায়িত হলে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ কমবে।

বাংলাদেশের কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে কৃষকদের সংকট কেবল তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পাবনার সেচ সংকট এবং যশোরের কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার ঘটনা শুধু এই দুই জেলার সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের কৃষকদের সামগ্রিক অবস্থা প্রতিফলিত করে। কৃষকদের সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। সরকারের উচিত কৃষি উপকরণের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা, এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।

এগ্রিবার্তা ডেস্ক

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।