ফুলের রাজ্য সাবদি, ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে দর্শনার্থীর ভিড়
বর্ণিল রঙে সেজেছে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবদি গ্রাম। যেদিকে চোখ যায়, শুধুই ফুলের সমারোহ। ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে অবস্থিত এই গ্রামটি এখন বাণিজ্যিকভাবে ফুলচাষের জন্য পরিচিত। কৃষকদের প্রচেষ্টা ও অনুকূল পরিবেশে দিন দিন বেড়েছে ফুলের আবাদ, যা বদলে দিচ্ছে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা।
একসময় শুধুমাত্র শখের বসে ফুলচাষ করতেন এখানকার কৃষকেরা। তবে এখন ফুল চাষই হয়ে উঠেছে প্রধান আয়ের উৎস। গাঁদা, গ্লাডিওলাস, ডালিয়া, সূর্যমুখী, জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা, নয়নতারা—নানান জাতের ফুলের চাষ হয় এখানে। মাঠভরা ফুলের গন্ধ আর সৌন্দর্য প্রতিনিয়তই মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের।
ফুলচাষ লাভজনক হওয়ায় এখানকার মানুষ ধীরে ধীরে অন্যান্য ফসলের চাষ ছেড়ে ফুলের দিকে ঝুঁকছেন। বর্তমানে সাবদি গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে ফুলের সঙ্গে যুক্ত। কেউ ফুল চাষ করেন, কেউ ফুল সংগ্রহ করেন, আবার কেউ মালা গেঁথে বিক্রি করেন। ফলে কর্মসংস্থান হয়েছে শত শত মানুষের, অর্থনীতিতেও এসেছে পরিবর্তন।
ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। বিশেষ করে ছুটির দিনে কিংবা বিশেষ উৎসবে এই গ্রাম হয়ে ওঠে পর্যটনকেন্দ্রের মতো। দর্শনার্থীরা ফুলবাগানের ভেতরে হাঁটেন, ছবি তোলেন এবং ফুলের মালা ও গহনা কেনেন।
কেরানীগঞ্জ থেকে ঘুরতে আসা মাহবুব বলেন, "শহরের ইট-পাথরের ব্যস্ত জীবনের বাইরে এসে এমন জায়গায় মন ভরে যায়। এখানকার ফুলের দৃশ্য সত্যিই অপূর্ব।"
অন্যদিকে, ঢাকার আফসানা বলেন, "শাহবাগে যে ফুল কিনি, সেগুলো কোথা থেকে আসে, তা জানতে এসেছি। এখানে এসে পুরো ব্যাপারটা কাছ থেকে দেখা গেল।"
সাবদির কৃষকরা সারা বছর ফুল চাষ করেন, তবে বিশেষ কিছু মৌসুমে ফুলের চাহিদা বেশি থাকে। ভালোবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন, একুশে ফেব্রুয়ারি, পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবসসহ বিশেষ দিনগুলোতে ফুলের চাহিদা বাড়ে, ফলে দামও ভালো পাওয়া যায়।
তবে এবার কিছুটা দেরিতে ফুল ফুটেছে, ফলে চাষিরা শঙ্কিত। সামনে রোজা শুরু হবে, ফলে ফুলের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। কৃষক জাকির হোসেন বলেন, "আমি ৪৫ শতাংশ জমিতে ফুল লাগিয়েছি। আশা করছিলাম ভালো দাম পাব, কিন্তু ফুল দেরিতে ফুটেছে, ফলে এখন লাভ নিয়ে চিন্তায় আছি।"
বন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত জানান, "সাবদি এলাকায় ফুলচাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, রোগবালাই দমন এবং সার্বিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকেরা মৌসুম শেষে কম দামে ফুল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।"
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সেলিমা খাতুন বলেন, "ফুলচাষ লাভজনক। সরকারিভাবে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে চাষিরা আরও ভালো দাম পাবেন।"
সাবদি এখন শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি স্বপ্ন বুননের এক কেন্দ্রস্থল। ফুলের সৌরভে বদলে গেছে এখানকার মানুষের জীবন। তবে দীর্ঘস্থায়ী উন্নতির জন্য কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং বাজারজাতকরণ সহজ করতে হবে।
এগ্রিবার্তা ডেস্ক
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।