২৭ আগস্ট ২০২৬ · ঢাকা, বাংলাদেশ
এগ্রি বার্তা মাটির খবর, মানুষের কথা
কৃষি

শীত কম, কৃষি ক্ষতির মুখে

এগ্রিবার্তা ডেস্ক ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ · ৬ মিনিট পড়ার সময় · ১ বার পঠিত
শেয়ার করুন:
শীত কম, কৃষি ক্ষতির মুখে

এবারের শীত যেন নিজেই দোটানায়! মাঘের শেষ প্রান্তে এসেও রাজধানীতে ঠান্ডার সেই প্রচলিত অনুভূতি নেই। উত্তরের কিছু এলাকায় শীতের ছোঁয়া থাকলেও তা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। দিনের বেলায় রোদের তেজ এতটাই বেশি যে বাইরে বের হলে গরম অনুভূত হচ্ছে। সাধারণত এই সময়টায় তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কবলে পড়ে দেশ, কিন্তু এবার তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। শীতের সময় কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে কৃষি খাত। ফসলের রোগবালাই বেড়ে যাচ্ছে, উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শীত না থাকলে কিছু ফসলের ফুল ফোটার হার কমে যায়, আবার কিছু ফসল অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত পরিণত হয়, ফলে ফলন কমে যায়। এই অবস্থায় নতুন জাতের ফসল ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনের পাশাপাশি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

বাংলাদেশের ঋতুচক্র ছয়টি হলেও আবহাওয়াবিদদের মতে, বাস্তবে চারটি ঋতু বিদ্যমান—বর্ষাপূর্ব, বর্ষা, বর্ষা-পরবর্তী ও শীতকাল। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল ধরা হয়। বছরের শুরুতে কিছুটা শীত অনুভূত হলেও সেটি টিকেছিল মাত্র সপ্তাহখানেক। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই শীতের বিদায়ঘণ্টা বেজেছে। শহরাঞ্চলে শীতের অস্তিত্ব ছিল প্রায় অনুপস্থিত।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দেশে একটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহও হয়নি, যা ২০১৬ সালের পর প্রথমবারের মতো ঘটল। জানুয়ারির স্বাভাবিক সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এর পাশাপাশি বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শীত অনুভূত হয়নি।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এবারের শীতের দুর্বলতার অন্যতম কারণ বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন। ভূমধ্যসাগর থেকে আসা বাতাস ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় প্রচুর জলীয় বাষ্প বহন করায় ঠান্ডা বাতাস নিচের স্তরে নামতে পারেনি, ফলে শীত স্থায়ী হয়নি।

শীতকাল কৃষির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম, যেখানে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, শীতকালীন সবজি এবং বিভিন্ন ডাল ও তেলবীজ উৎপন্ন হয়। কিন্তু তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে এসব ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ দাউদ হোসেন বলেন, শীতকালীন ফসলের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা দরকার। কিন্তু যখন তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, তখন ফসল দ্রুত পরিণত হয়, ফলে ফলন কমে আসে। শীতের সময় কমে যাওয়ায় গম, আলু ও সরিষার উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের চাষি আব্দুর রহমান বলেন, এবার শীত তেমন ছিল না, ফলে আলুর গাছ ভালো হলেও আলুর আকার ছোট হয়েছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য বেশি হলে ধানে ব্লাস্ট রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এম জাকির হোসেন খান বলেন, দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ছাইফুল আলম বলেন, শীত কম হলে ফসলের বীজ সঠিকভাবে পরিণত হতে পারে না, ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ সমস্যার সমাধানে জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ঋতুর বৈচিত্র্য দিন দিন বদলে যাচ্ছে। শীতের সময় ও তীব্রতা কমে যাওয়ায় কৃষি খাত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিবর্তন দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, যাতে ভবিষ্যতের কৃষি উৎপাদন ও জীবনযাত্রা সুরক্ষিত রাখা যায়।

এগ্রিবার্তা ডেস্ক

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।